
বর্তমান বাংলাদেশে অপসাংবাদিকতার বিস্তার এবং সাংবাদিকতার নামে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে মূলধারার সাংবাদিকতা। হাতে গোনা কিছু অসাধু ও অপেশাদার ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পেশাদার সাংবাদিকদের ওপর। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে প্রকৃত সংবাদকর্মীদের গ্রহণযোগ্যতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও পেশাগত মর্যাদা ধরে রাখা ক্রমেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
সাংবাদিকতা একটি মহান, দায়িত্বশীল ও জনকল্যাণমূলক পেশা। এই পেশার মূল ভিত্তি হলো সত্যনিষ্ঠা, বস্তুনিষ্ঠতা, নিরপেক্ষতা, অনুসন্ধানী মনোভাব এবং জনস্বার্থের প্রতি অঙ্গীকার। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বর্তমানে বিভিন্ন এলাকায় সাংবাদিকতার ন্যূনতম জ্ঞান, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত নীতিমালা সম্পর্কে ধারণা ছাড়াই অনেকে নিজেদের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। মোবাইল ফোনে ছবি তুলে তার সঙ্গে কয়েকটি বাক্য লিখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেই কেউ কেউ নিজেদের ‘ছবি নিউজ সাংবাদিক’ হিসেবে পরিচিত করার চেষ্টা করছেন।
অথচ সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই, সূত্র নিশ্চিতকরণ, সংবাদ সম্পাদনা এবং সাংবাদিকতার নৈতিকতা সম্পর্কে তাঁদের অনেকেরই পর্যাপ্ত ধারণা নেই।
রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কর্মসূচিতে উপস্থিত হয়ে ছবি তুলে ফেসবুকে প্রকাশ করার মাধ্যমে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার প্রবণতাও লক্ষ করা যায়। কেউ কেউ ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজ, অনলাইন পোর্টাল কিংবা ফেসবুকভিত্তিক চ্যানেল খুলে নিজেদের সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করছেন। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সংবাদসদৃশ কনটেন্ট তৈরি করেও তা প্রচার করা হচ্ছে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার নিজে কোনো অপরাধ নয়; বরং যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য প্রকাশ, বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন এবং পেশাগত পরিচয়ের অপব্যবহারই উদ্বেগের বিষয়।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয়কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। সংবাদ প্রকাশের হুমকি দিয়ে অর্থ আদায়, ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল কিংবা অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডের অভিযোগও বিভিন্ন সময় সামনে আসে। এ ধরনের অভিযোগের যথাযথ তদন্ত ও প্রমাণসাপেক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। কারণ, সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কাউকে হয়রানি করা বা অর্থ আদায়ের চেষ্টা কোনোভাবেই পেশাগত নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার, অর্থ উপার্জনের অবৈধ কৌশল কিংবা মানুষকে জিম্মি করার হাতিয়ার হতে পারে না। এটি একটি জবাবদিহিমূলক পেশা, যেখানে প্রতিটি সংবাদকর্মীকে তাঁর প্রকাশিত তথ্য, বক্তব্য ও প্রতিবেদনের জন্য দায়বদ্ধ থাকতে হয়। পরিচয়পত্র, প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, সংবাদ সংগ্রহের দক্ষতা, তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস এবং নৈতিক দায়িত্ববোধ—এসবই একজন পেশাদার সাংবাদিকের পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অপসাংবাদিকতার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মাঠপর্যায়ে কাজ করা প্রকৃত সংবাদকর্মীরা। তাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য সংগ্রহ, সত্য উদ্ঘাটন, জনদুর্ভোগ তুলে ধরা, অনিয়ম-দুর্নীতির খবর প্রকাশ এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন। অথচ কিছু ব্যক্তির অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁদেরও কখনো কখনো সন্দেহের চোখে দেখা হয়। এতে সাংবাদিকতা পেশার প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি গণমাধ্যমের সামাজিক দায়িত্ব পালনও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্য, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পোস্ট কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রকাশের মাধ্যমে কিছু ব্যক্তি সম্মানিত মানুষের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করেন। অথচ একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের কাজ কাউকে অযথা হেয় করা নয়; বরং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় তুলে ধরা। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তাঁর বক্তব্য নেওয়া, তথ্যের সত্যতা যাচাই করা এবং ন্যায্যতা বজায় রাখা সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব।
প্রকৃত সাংবাদিক কখনো ব্যক্তিগত আক্রোশ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা আর্থিক সুবিধার জন্য সংবাদকে ব্যবহার করেন না। তিনি সত্য প্রকাশে আপসহীন থাকেন, তবে একই সঙ্গে ব্যক্তির মর্যাদা, মানবিক মূল্যবোধ, আইনি অধিকার এবং পেশাগত নৈতিকতার প্রতিও শ্রদ্ধাশীল থাকেন। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই স্বাধীনতার দায়িত্বশীল ব্যবহারও অপরিহার্য।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সাংবাদিকতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, সম্পাদক, পেশাজীবী সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। সংবাদকর্মীদের পেশাগত প্রশিক্ষণ, পরিচয় যাচাই, নৈতিক সাংবাদিকতার চর্চা, ভুয়া পরিচয়ের অপব্যবহার প্রতিরোধ এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিটি কনটেন্টকে সংবাদ হিসেবে বিবেচনা না করে তার উৎস, সত্যতা ও প্রেক্ষাপট যাচাই করার বিষয়ে সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে।
**সাংবাদিকতা পরিচয়ের বিষয় নয়, এটি দায়িত্ব ও বিশ্বাসের বিষয়।** শুধু হাতে ক্যামেরা, মোবাইল ফোন কিংবা একটি ফেসবুক পেজ থাকলেই কেউ প্রকৃত সাংবাদিক হয়ে ওঠেন না। একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয় তাঁর সততা, পেশাগত দক্ষতা, বস্তুনিষ্ঠতা, জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সত্য প্রকাশের সাহসের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়।
অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা ও পেশাগত জবাবদিহি গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। কারণ, কিছু ব্যক্তির অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো সাংবাদিক সমাজের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হতে দেওয়া যায় না। প্রকৃত সাংবাদিকদের সম্মান রক্ষা, গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা অটুট রাখা এবং জনগণের কাছে সত্যনিষ্ঠ সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার স্বার্থেই অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে নৈতিক ও আইনসম্মত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
এম.এ রাশেদ
সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার





