
গ্রাম শুধু মানচিত্রের একখণ্ড ভূখণ্ড নয়; গ্রাম একটি জাতির শিকড়, ঐতিহ্যের ধারক, সংস্কৃতির আশ্রয় এবং ভবিষ্যতের আলোকবর্তিকা।
বাংলাদেশের প্রাণ তার গ্রামে, তার মাটিতে, তার সহজ-সরল মানুষের ভালোবাসায়। এ দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির গভীর শিকড় প্রোথিত গ্রামীণ জনপদে। অথচ অশিক্ষা, বাল্যবিবাহ, মাদকাসক্তি, বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য ও নানা অনিয়মের অন্ধকার আজও বহু গ্রামের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই অন্ধকার দূর করতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি প্রয়োজন মানুষের সম্মিলিত জাগরণ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। সেই লক্ষ্যেই প্রতিটি গ্রামে গড়ে উঠতে পারে একটি ‘সামাজিক উন্নয়ন পরিষদ’।
নাটোরের সিংড়া উপজেলার হুলহুলিয়া গ্রাম সামাজিক সংহতি, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্মিলিত উদ্যোগের এক অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত। এ গ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে স্থানীয় বাস্তবতা ও মানুষের প্রয়োজনের আলোকে দেশের অন্যান্য গ্রামেও গড়ে তোলা যেতে পারে কার্যকর সামাজিক উন্নয়নব্যবস্থা।
প্রস্তাবিত পরিষদে শিক্ষক, ধর্মীয় প্রতিনিধি, নারী, যুবসমাজ, কৃষক, সমাজকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার দায়িত্বশীল মানুষকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। তবে পরিষদের ভিত্তি হতে হবে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি ও জনকল্যাণ। কোনো ব্যক্তি, রাজনৈতিক গোষ্ঠী কিংবা প্রভাবশালী মহলের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ যেন এর মহৎ উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
শিশুর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, মাদকবিরোধী সচেতনতা সৃষ্টি, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে সহযোগিতা এবং নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার রক্ষায় পরিষদটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি সরকারি সহায়তা প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে পৌঁছানো এবং অনিয়মের অভিযোগ যথাযথ কর্তৃপক্ষের নজরে আনতেও এটি সহায়ক হতে পারে।
তবে এ পরিষদ কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান, আইনগত কর্তৃপক্ষ কিংবা প্রচলিত স্থানীয় সরকারব্যবস্থার বিকল্প হবে না; বরং আইন, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সহযোগী হিসেবে কাজ করবে। বিচার-সালিশের নামে পক্ষপাত, জবরদস্তি কিংবা বেআইনি হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ রাখা যাবে না। মানুষের মর্যাদা ও আইনের শাসনই হবে এর পথচলার মূল ভিত্তি।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসন সমন্বিত ভূমিকা রাখতে পারেন। প্রাথমিকভাবে কয়েকটি গ্রামে পরীক্ষামূলকভাবে পরিষদ গঠন, সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন এবং কার্যক্রমের ফলাফল মূল্যায়নের মাধ্যমে একটি কার্যকর মডেল তৈরি করা সম্ভব। সফলতার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে তা সারা দেশে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন মানে শুধু পাকা রাস্তা, সেতু কিংবা দালানকোঠা নয়; প্রকৃত উন্নয়ন হলো মানুষের মনে শিক্ষার আলো জ্বালানো, জীবনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং সমাজে ন্যায়বোধ, মানবিকতা ও সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় করা।
গ্রামকে বাঁচাতে হলে বাঁচাতে হবে গ্রামের মানুষ, তাদের স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও মানবিক মূল্যবোধকে। সরকার ও জনগণের সম্মিলিত প্রয়াসে প্রতিটি গ্রাম হয়ে উঠুক শান্তি, সম্প্রীতি, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার উজ্জ্বল ঠিকানা।
আসুন, গ্রামের প্রতি অবহেলা নয়, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে এগিয়ে আসি। মানুষের সম্মিলিত শক্তিতে জাগিয়ে তুলি গ্রামবাংলার সুপ্ত সম্ভাবনা। কারণ, গ্রামের আলো নিভে গেলে দেশের অগ্রযাত্রাও অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।
আমাদের অঙ্গীকার হোক—
গ্রাম বাঁচাই, মানুষের স্বপ্ন বাঁচাই;
গ্রাম গড়ি, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ি।
গ্রাম বাঁচলে দেশ বাঁচবে।
-মকবুল হোসেন মজুমদার
কলাম লেখক








