আজ শুভ্র শারদ প্রাতে পিতৃপক্ষ এবং দেবী পক্ষের শুভ সন্ধিক্ষনে প্রনতি। তোমার আগমন বার্তা ঘোষিত হলো আকাশে বাতাসে বন পল্লব পদ্মালয়ে। মন্দিরে মন্দিরে, কুল কুন্ডলিনী, দুর্গাতিনশিনী অসুরদোলনী দুর্গা মাতা। তোমার শুভাগমনে এ বিশ্ব প্রকৃতি মহান আলোয় আলোকিত পুত পবিত্রতার আনন্দিত ভক্ত হৃদয় সনাতনী ধারায় পূর্ব পূরুষের আত্মার শান্তির কামনায় জলদান, তিলদান, বা তর্পন করা হয়। দেবী দুর্গা এই পূর্ণ তিথিতে পৃথিবীতে অবতরন করেন মহালয়ায় পিতৃপক্ষ আর দেবীপক্ষের সন্ধিক্ষনে মহালয়া।
উত্তরায়ণ কালে দেব লোকে দিন। দক্ষিনারয়ন কালে রাত। দক্ষিনায়নের ছয় মাস দেবতাগন নিদ্রিত কিন্তু যম লোকে তখন দিন। এ সময় পিতৃপুরুষরা ছুটে আসেন মর্ত লোকে। উত্তর পুরুষদের কাছে শ্রাদ্ধাহার পেলেই তারা পরম তৃপ্ত। তৃপ্ত হয়ে আর্শিবাদ করেন। আর যারা পিতৃ পুরুষের নামে জলদান তর্পন করেন না। তাদের বংশে উন্নতির স্থলে অবনতি নেমে আসে অমঙ্গল বারতা। তাই মঙ্গলময়ীর আগমন উপলক্ষে গীতা অথবা চন্ডী পাঠের মাধ্যমে পিতৃ তপন বিধেয়।
ওঁ নমঃ আ.ব্রক্ষা ভুবনাল্লোকা.
দেবষি পিতৃ মানবাঃ তৃপাতু
জন্মান্তর ও কর্মবাদ গ্রন্থে একটি গল্পের উল্লেখ রয়েছে। দুই ব্যক্তি বহুদিন যাবত নরক কুন্ডে পরে আছে। নারদ মনি স্বর্গে রাজা ইন্দ্রকে জিজ্ঞেসা করলেন। রাজা ইন্দ্র বললেন, এদের নামে কেউ জলদান বা তর্পন করেনি। বহুদিন পূর্বে গ্রামে পুষ করা লেগে অনেক মানুষ মৃত্যু বরণ করে। ঐ গ্রামে একটি মাত্র ছোট্ট মেয়ে বেচেঁ ছিলো। সে বারবনিতার ঘরের বড় হয়। পিতা মাতার ওপর সে খুব ক্ষুদ্ধ। নারদ মুনি নরক পুরীতে যন্ত্রনা কাতর ব্যাক্তিদ্বয়ের আত্মার মুক্তির জন্য দরিদ্র ব্রাক্ষান বেশে সেই মেয়ের কাছে গিয়ে তার পিতা মাতার আত্মার শান্তির জন্য কিছু দান চাইলেন।
সেই মেয়ে ব্রাক্ষন কে দান তো দিলেন না বরং তার মৃত পিতা মাতার ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে। ব্রক্ষানকে তাড়িয়ে দিলেন। মেয়ের মনে কষ্ট পিতা মাতা আমাকে জন্ম দিয়ে আমাকে নরক যন্ত্রনায় নিক্ষেপ করেছে। আমি আজ সমাজে গৃনিত বেশ্যা। নারদ মুনি একে একে দুই দিন তিন দিন সেই মেয়ের দারে গিয়ে দান চাইলেন। একদিন সকালে মেয়েটি নদীর ঘাটে স্নান করতে গিয়েছে। সেখানে ব্রাক্ষান বেশে নারদ মুনি দান চাইলেন। ঠিক আছে মা তুমি তোমার মৃত পিতা মাতার নামে তিন অঞ্জলি জলই দাও। মেয়ে রাগ নিয়েই তিন অজ্ঞলি নদীর জল ছিটিয়ে তিরের উদ্দেশ্যে দিলেন।
নারদ ফিরে এসে দেখেন নরকে সেই ব্যক্তিদ্বয় মুক্তি পেয়ে চলে গেছে। কারণ কী নারদ দেখলেন নদীর তীরে তৃষ্ণার্থ পিপিলিকার দল বেধে অবস্থান করছিল। নদীর ঢেউয়ে কারণে জলে নামতে পারেনি। তার ছিঞ্চিত জল পান করে তৃপ্তি হয়ে পিপিলিকা চলে যায়। পিতৃ পুরুষের উদ্দেশ্যে মহালয়া বা বাৎসরিক মৃত্যু দিবসে তর্পন বা বৈষ্ণব সেবা দানধ্যান করতে হয়।
[ শাস্ত্র মতে বিধীন রয়েছে আমাদের ৩৬৫ দিন এক বছর, প্রেতের তা এক দিন।]
মহালয়ার দিনটি কিন্তু পিতৃপুরুষের তর্পনের জন্য এক মাত্র নির্ধারিত নয়। প্রকৃত পক্ষে মহালয়ার চৌদ্ধ দিন পূর্বেও কৃষ্ণপ্রতিপদ থেকেই শুরু হয়। পিতৃ তর্পনে লক্ষ পরলোক গত পূর্ব সুরিরা মত্যলোকে নেমে আসেন। দীপানিতা কালীপূজা পর্যন্ত সেই সব পিতৃপুরুষের আত্মা অপেক্ষা করেন। আপনার গৃহে বাসে কুকুর, বিড়াল, পশু পাখি অথবা বৃক্ষাদী রয়েছে। তারা হয়তো আপনার কোন পূর্ব পুরুষ আপনাকে ঘিরে অবস্থান করছে। বৃক্ষ ছায়াদান করছে। চুড়াশী লক্ষ জনি তত্ত্ব জ্ঞানীর কাছে জেনে নিন। হিসেব সহজেই মিলে যাবে।
পিতৃ শব্দের জনক জননী উভয় কেই বোঝানো হয়েছে। পিতামহ পিতা সঙ্গী, মাতা মহ, মাতা সঙ্গী সহ গুরুকুল এমনকি বিশ্ব সংসারের স্থাবর জঙ্গল সকল প্রানীর জন্য তর্পনের বিধান রয়েছে। যাতে তর্পনের সময় উলব্ধি করা যায়। আপন জনের আত্মার আর বিশ্বজনের আত্মায় কোনোও ভেদ নেই। অখিল বিশ্বই তার নিজের পরিবার। পুজা যজ্ঞদান অনুষ্ঠানে দাতা গ্রহীতা উভয়ই আনন্দিত ও পরম শান্তি লাভ করেন। বিষয়টি যদি ভক্তি যুক্ত শ্রদ্ধান্তিত হয়। আমাদের শাস্ত্র মতে বলা হয়েছে শ্রদ্ধায় দেয়ম। মহালয়ার প্রকৃতবার্তা সার্বজনীন উদার তা যার দ্বারা তৃপ্তি হয় তাই তর্পন।
দেহ বিলীন হলে ও আত্মা অবিনশ্বর: বিশ্বের সব ধর্মেই এ স্বীকৃতি রয়েছে। যজুবেদীয় মতে তর্পন করার জন্য প্রথমে তর্পন বিধি অনুযায়ী পবিত্র হয়ে নদী বা জলাশয়ে জল দ্বারা হয় অথবা ঘরে বসেই শুদ্ধ জল দ্বারা তর্পন করা যায়। তর্পন ধাপ সমূহ- আচমন ও বিষ্ণু স্বরণ, দেব তর্পন, ঋষি তর্পন, পিতৃ তর্পন
হিন্দু শাস্ত্র মতে বিশেষ পরিস্থিতিতে মেয়েরাও তর্পন ও শ্রাদ্ধ্য করতে পারে। ওঁ পিতা স্বর্গ পিতা ধর্মঃ পিতাহি পরমং তপ। পিতরি প্রীতিমাপন্নে প্রীয়ন্তে সর্ব দেবতাঃ”
মহালয়া শুধুই একটি তিথি নয়। বাঙালীর সেরা শারদ উৎসবের শুভ সুচনা। দ্বাপর যুগে কৃত্তিবাস রামায়ণ বর্ণিত শ্রীরাম কর্তৃক অকালবোধন। মহালয়ার তর্পনের পরিধি শুধু মাত্র পিতৃ তর্পনে কর্তব্যে আবদ্ধ নয়। মহালয়ার প্রকৃত বার্তা সার্বজনীন উদারতা আজ শক্তিরুপীনি বিশ্ব জননীর শারদ শ্রীমন্ডিত প্রতিমা মন্দিরে মন্দিরে ধ্যান গ্রহিতা। সনাতনী শক্তিরূপা জ্ঞানময়ী হে ভগবতী মহামায়া যোগেশ্বরী যোগমায়া কাত্যায়নী তুমিই বাসন্তিকা তুমিই ত্রিগনাতিকা তুমি রজগুনে ব্রক্ষার গৃহিনী, বাগদেবী সত্বঃ গুনে বিষ্ণুর পতি লক্ষীদেবী তমগুনে শিবের বনিতা পারবতি আবার গুনাতিত তুমিই অর্নিবচ্চনিয়া আবার আদি শক্তি দেবী দুর্গা নিজ দেহ স¤ু¢তা তেজ প্রবাহে।
শক্রদহন কালে অগ্নিবর্ণা অগ্নিলোচনা উষালগ্নে হে, মহাদেবী তোমার উদ্ভোধনে প্রাণের ভক্তিরুপে আলোকিত হোক দশ দিগন্ত। হে অমিত জ্যোতি হে দুর্গাতি হারিনী মা দূর্গা তোমার আগমনে ধরণী হোক প্রেমময়ী জাগো জাগো মা——- জাগো দুর্গা জাগো দশপ্রহরণ ধারিনী অভয়া শক্তি বল প্রদায়নী তুমি জাগো দেবী প্রসীদ্ধ পরিপালয়ে জননী।
রণজিৎ মোদক
শিক্ষক, কবি, সাংবাদিক
দাপা, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ
০১৭১১৯৭৪৩৭২



