বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন, বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন আজ বিষে মরছে। যে বনকে সারা দুনিয়া চেনে রয়েল বেঙ্গল টাইগার আর অপরূপ সৌন্দর্যের জন্য, সেই বনের নদী-খালেই এখন মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রাণঘাতী কীটনাশক।
এটাই এখন সুন্দরবনের প্রতিদিনের ছবি। এক শ্রেণির অসাধু চক্র রাতের আঁধারে নদীতে কীটনাশক ছিটিয়ে মাছ ধরছে। এতে শুধু মাছ মরছে না, মরছে সুন্দরবনের জলজ খাদ্যশৃঙ্খল, মরছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবিকা।
বন বিভাগ বলছে, এই অপরাধ ঠেকাতে তারা টানা অভিযান চালাচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে ৪০৩টি মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছেন ৩৯৪ জন। তবে বন বিভাগের নিজের হিসাবেই গ্রেপ্তার ও মামলার সংখ্যায় কিছুটা গরমিল আছে।
গত ১০ মাসে বনের গভীর থেকে নদী-খাল পর্যন্ত নিয়মিত টহল দিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২ হাজার ৮৯২ মিটার হরিণ ধরার ফাঁদ, ৫২২ কেজি হরিণের মাংস, ২৯টি ট্রলার, ৪০৫টি নৌকা, ৪৮৩টি কাঁকড়া ধরার আটন, ৯ হাজার ৫৩২ মিটার দোন দড়ি, ৩ হাজার ৭৬০ কেজি মাছ, ৪ হাজার ১৪২ কেজি অবৈধভাবে ধরা কাঁকড়া। এছাড়া জব্দ হয়েছে ১৮৮ বোতল মাছ ধরার বিষাক্ত কীটনাশক ও ১ হাজার ২৭৩ কেজি মধু।
অসাধু চক্র প্রথমে মাছের চলাচল দেখে নেয়। তারপর নীরবে পানিতে রিপকর্ডসহ বিভিন্ন নামের কীটনাশক ঢেলে দেয়। মুহূর্তেই মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, জলজ কীটপতঙ্গ মারা যায়। এই বিষাক্ত মাছ বাজারে বিক্রি হয়, মানুষের শরীরেও ঢুকে যায় বিষ।
পুষ্পকাঠি, কাটেশ্বর ছাড়াও পশুর নদী, জয়মনি, কচিখালি, হড্ডা, শিবসা, নীলকমল, বজবজা, খাসিটানা এলাকায় এই অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এই চক্রকে থামাতে সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগ ১৩৫ জনের একটি বিশেষ তালিকা করেছে। তাদের গতিবিধির উপর নজর রাখা হচ্ছে। স্টেশন ও টহল ফাঁড়িগুলোকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, বিষ দিয়ে মাছ ধরলে শুধু মাছ নয়, পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হয়। দূষিত মাছ খেলে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হয়।
সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাছানুর রহমান বলেন, অল্প লোকবল দিয়ে এতো বড় বন পাহারা দেওয়া কঠিন। তবুও সবাই চেষ্টা করছেন। সবার সহযোগিতা পেলে অপরাধ আরও কমবে।
সুন্দরবনকে বাঁচাতে হলে শুধু বন বিভাগের অভিযান যথেষ্ট নয়। আজ বিষ দিয়ে মাছ ধরতে দেওয়া মানে আগামীকাল নিজের সন্তানের মুখের ভাত কেড়ে নেওয়া। এই বিশ্ব ঐতিহ্য বাঁচলে বাঁচবে কয়রা, বাঁচবে খুলনা, বাঁচবে বাংলাদেশ।








