ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী এডেনে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ লক্ষ্য করে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১৬ জন। দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের আসন এই প্রাসাদে হামলার সময় প্রধানমন্ত্রী ও অন্য মন্ত্রীরা অক্ষত ছিলেন বলে জানিয়েছেন ইয়েমেনের তথ্যমন্ত্রী। বিবিসিকে তথ্যমন্ত্রী মুয়াম্মার আল-এরিয়ানি জানান, আল-মাশিক প্রাসাদ লক্ষ্য করে পাঁচটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। এতে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের কোনো ক্ষতি হয়নি।
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারিয়া দাবি করেন, তারা এডেনে সৌদি শত্রুর সামরিক অভিযান পরিচালনার সদর দপ্তরে হামলা চালিয়েছেন। সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন একটি জোট ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে। ইরান-সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে সরকারি বাহিনীর অভিযানে জোটটি আকাশপথে সহায়তাও করছে। ইয়েমেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী কাসিম বুহাইবেহ জানান, নিহত ও আহতদের মধ্যে প্রাসাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি এবং বেসামরিক কর্মীরাও রয়েছেন। এডেনে হুতিদের হামলার নিন্দা জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শায়া জিন্দানি।
তিনি এ হামলাকে কাপুরুষোচিত আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি হুতিদের অপরাধমূলক আচরণের ধারাবাহিকতা। জিন্দানি বলেন, সরকার দায়িত্ব পালন অব্যাহত রেখেছে। হুতিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় লোহিত সাগর উপকূলসহ বিভিন্ন রণাঙ্গনে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এ হামলা সরকারি বাহিনীর মনোবল দুর্বল করতে পারবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এর আগে বৃহস্পতিবার সৌদি আরবে হামলা চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছিল হুতিরা। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, তাদের বাহিনী মদিনা অঞ্চলে একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।
ইসলাম ধর্মের অন্যতম পবিত্র স্থানগুলোর একটি এই অঞ্চলে অবস্থিত। পশ্চিম ইয়েমেনে হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ডে হামলার জবাবে সৌদি আরবের বিমানবন্দর, তেল-গ্যাস স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে হুতিরা। তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার মধ্যে রাজধানী সানাও রয়েছে। শনিবার রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন নিহত হন। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সৌদি আরবের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী রায়েদ ক্রিমলি অভিযোগ করেছেন, হুতিদের সঙ্গে সংঘাত বাড়াতে ইরান উৎসাহ দিচ্ছে। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, সাংবাদিকদের ক্রিমলি বলেন, ‘জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব লঙ্ঘন করে ইরান এখনো হুতি মিলিশিয়াদের অস্ত্র দিচ্ছে, প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং সমর্থন জোগাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা মনে করি, সংঘাতের এই পর্যায়ে হুতিদের উত্তেজনা বাড়ানোর পেছনে ইরানের উৎসাহ রয়েছে।’এ বিষয়ে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
তবে অতীতে হুতিদের অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ অস্বীকার করেছে তেহরান। তাদের দাবি, হুতিদের তারা শুধু রাজনৈতিকভাবে সমর্থন দেয়। তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও বলেছেন, সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে আলোচনা শুরুর পথ সুগম করতে প্রয়োজনীয় যেকোনো সহায়তা দিতে তার দেশ প্রস্তুত। ইয়েমেনে ২০১৪ সালে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ওই বছর হুতিরা রাজধানী সানা থেকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে উৎখাত করে। ২০১৫ সালে সরকারকে পুনর্বহালের লক্ষ্যে সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোট সামরিক হস্তক্ষেপ করলে সংঘাত আরও তীব্র হয়।
চার বছর ধরে চলা একটি অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি গত জুলাইয়ে ভাঙতে শুরু করে। ওই সময় হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণা করে এবং দেশটির বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও লোহিত সাগরে চলাচলকারী ট্যাংকার লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে। হুতিদের দাবি, তাদের নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডে সৌদি অবরোধ এবং সানা বিমানবন্দরে বিমান হামলার জবাবেই তারা এসব পদক্ষেপ নিয়েছে। সানা বিমানবন্দরে হামলার জন্য সৌদি আরবকে দায়ী করেছে গোষ্ঠীটি। গত সেপ্টেম্বরে বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় লোহিত সাগর উপকূলের একটি অংশ দখল করে নেয় হুতিরা।
বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই সরু জলপথের নিয়ন্ত্রণ ঘিরে সংঘাত আরও বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের পর তেলের দাম বৃদ্ধিতেও হুতিদের অগ্রযাত্রা ভূমিকা রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত সপ্তাহে সৌদি বিমান হামলার সহায়তায় বড় ধরনের পাল্টা অভিযান চালিয়ে বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর নজরদারির সুবিধাজনক ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের দাবি করে সরকারি বাহিনী। ইয়েমেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত ৬ আগস্ট থেকে দেশটিতে চলমান লড়াইয়ে অন্তত ১ হাজার ২৮২ জন নিহত এবং ৫ হাজার ৮৯০ জন আহত হয়েছেন।
সূত্র: বিবিসি








