শিরোনাম

নিথর দেহ ফিরছে বৃহস্পতিবার : স্বপ্নের সমাধি কম্বোডিয়ায়

প্রকাশ:
পড়তে সময় লাগবে ৪ মিনিটপড়া হয়েছে ০ বার

তাদের স্বপ্ন ছিল বিদেশ বিভুঁইয়ে গিয়ে খেটে উপার্জন করে দেশে থাকা পরিবারে আনবেন স্বচ্ছলতা। কিন্তু সেই স্বপ্ন হয়ে রইল অধরা, চার প্রবাসী দেশে ফিরছে নিথর দেহে কফিনবন্দি হয়ে।

বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৫ মিনিটে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে কম্বোডিয়া থেকে ঝিনাইদহের সোহাগ আহাম্মেদ (২৩), চুয়াডাঙ্গার আসিফ খান (২৪), বগুড়ার জুয়েল হোসেন (৫৩) এবং রাতের আরেকটি ফ্লাইটে শাহনাজ তালুকদারসহ চার বাংলাদেশির মরদেহ ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে বলে জানিয়েছে ব্র‍্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম।

সরকারি প্রক্রিয়ায় জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র নিয়ে গেলেও তাদের কেউ পাচারের শিকার হয়েছেন চীনা নিয়ন্ত্রিত সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে, আবার কেউ শিকার হয়েছেন কাজের নামে চরম প্রতারণার।

স্ক্যাম কম্পাউন্ডের বলি সোহাগ

ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার বারইপাড়া গ্রামের সোহাগ আহাম্মেদ ২০২৫ সালের এপ্রিলে জনশক্তি ব্যুরোর ছাড়পত্র নিয়ে কম্বোডিয়া যান। বিদেশ পাড়ি দিতে সোহাগের পরিবারকে করতে হয় ধারদেনা।

কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তাকে একটি চীনা নিয়ন্ত্রিত ভয়াবহ সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে পাচার করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করে তার পরিবার । দীর্ঘদিন নির্যাতন ও বন্দিদশায় থাকার পর ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সোহাগ মারা যান।

ছেলের এমন করুণ পরিণতি ও ঋণের বোঝা নিয়ে সোহাগের বাবা বিল্লাল হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি খুব গরিব মানুষ, সুদে ও ঋণ করে টাকা নিয়ে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। প্রায় ৯ লাখ টাকা খরচ করেছি। এখন ছেলেটাও শেষ, আর পাওনাদাররা প্রতিনিয়ত বাড়িতে এসে তাগাদা দিচ্ছে।”

মারা যাওয়ার আগে ছেলের সঙ্গে যোগাযোগের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “আমার সঙ্গে মারা যাওয়ার দুই দিন আগে কথা হয়েছিল, ওকে কথা বলতে দিত না।”

মরক্কোর নাম করে আসিফকে কম্বোডিয়ায় পাচার

চুয়াডাঙ্গার জীবননগর থানার শাহাপুর গ্রামের আসিফ খানকে মরক্কোয় কৃষি কাজের লোভ দেখিয়ে প্রতারণা করে পাঠানো হয় কম্বোডিয়ায়।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে স্থানীয় দালাল জাকিরের সহায়তায় দেশটিতে যাওয়ার পর মাত্র কয়েক মাসের মাথায় ২৮ মার্চ তিনি বিদ্যুতায়িত হয়ে প্রাণ হারান।

প্রতারণার বিবরণ দিয়ে আসিফের বাবা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার ছেলেকে বলা হয়েছিল মরক্কোয় নিয়ে কৃষি কাজ দেবে, কিন্তু বিমানে ওঠার পর কম্বোডিয়ার ভিসা হাতে দেওয়া হয়। কম্বোডিয়া যাওয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় কারেন্টের শকে সে মারা যায়। সাড়ে ৮ লাখ টাকা খরচ করে ছেলেকে হারিয়ে এখন আমরা নিঃস্ব।”

তিনি আরও বলেন, “আমার ছেলে কোনোদিন কারেন্টের কাজে অভ্যস্ত ছিল না। স্থানীয় দালালের ফাঁদে পড়ে আমরা ভাবছিলাম মুসলিম দেশে যাচ্ছে, কিন্তু তারা আমাদের সব শেষ করে দিল।”

প্রতারণা ও ঋণের জালে অন্য প্রবাসীরাও

একইভাবে কম্বোডিয়ায় কাজের সন্ধানে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন বগুড়ার ৫৩ বছর বয়সী জুয়েল হোসেন এবং প্রবাসী শাহনাজ তালুকদার।

এদের মধ্যে বৃহস্পতিবার রাতের একটি ফ্লাইটে ফিরবে শাহনাজের মরদেহ।

শাহনাজ তালুকদারের স্ত্রী রেক্তা খাতুন স্বামীর নির্মম পরিণতি ও বর্তমান পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার দুইটা ছোট ছোট বাচ্চা—একটার বয়স ৫ মাস, আরেকটার ৩ বছর। কিস্তি তুলে লোন নিয়ে সাড়ে ৫ লাখ টাকা দিয়ে স্বামী বিদেশে গিয়েছিল।

“এখন স্বামীও নাই, উপার্জনও নাই। ছোট বাচ্চা দুটো নিয়ে কীভাবে চলব আর কীভাবে ঋণের কিস্তি দেব, কিছুই বুঝতে পারছি না। চেয়েচিন্তে চলি।”

বিএমইটির ছাড়পত্র ছিল, তবু ঠিকানা স্ক্যাম সেন্টার

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য বলছে, গত দুই বছরে কম্বোডিয়ায় পাড়ি দিয়েছেন ১৬ হাজার ৩৬০ জন বাংলাদেশি।

তাদের অনেকেই দেশটিতে গিয়ে সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকে মুক্তি পেয়ে বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন। তাদের কারও কারও রয়েছে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের একজন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তাদের পরিবার হয়ত অপেক্ষা করছিল প্রিয় মানুষটি একদিন জীবিত ফিরে আসবেন। সেই অপেক্ষার শেষ প্রান্তে এখন ফিরছে শুধু কফিনবন্দি নিথর দেহ।

“এই মৃত্যুগুলো শুধু এই পরিবারের শোকের গল্প নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিরাপদ অভিবাসন, বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা, মানবপাচার, স্ক্যাম কম্পাউন্ড এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারির গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।”

তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যে কর্মীরা সরকারি প্রক্রিয়ায় ছাড়পত্র নিয়ে বিদেশে গেলেন, তারা কীভাবে পাচারের শিকার হলেন? বিদেশে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন যেন কোনো পরিবারের জন্য মৃত্যুসংবাদে পরিণত না হয় এটাই এখন সবচেয়ে বড় দাবি।”

সম্পর্কিত সংবাদ

এই বিভাগের আরও সংবাদ