চার বছর আগে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে সায়মন নামে এক পোশাক কর্মীর টাকা, মোবাইল ছিনতাইয়ের পর তাকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় তিন জনের প্রাণদণ্ডাদেশ ‘সমাজের প্রতি বার্তা’ বলে মন্তব্য করেছে আদালত।
ঢাকার ১৩ তম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জাহিদুল ইসলাম মঙ্গলবার রায়ের আগে পর্যবেক্ষণে এ কথা বলেন।
এদিকে রায়ে হত্যার দায়ে ইউসুফ, ইকবাল খাঁ ও মেহেদী হাসান মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড করা হয়েছে। আর ছিনতাই করা মোবাইল কেনার দায়ে (চোরাই মোবাইল) সুজন নামে একজনকে দেওয়া হয়েছে তিন বছরের কারাদণ্ড।
১৭ বছরের ওই কিশোরকে হত্যার রায়ের দিন ছিল মঙ্গলবার। কারাগারে থাকা তিন আসামি ইউসুফ, ইকবাল খাঁ ও মেহেদী হাসানকে আদালতে হাজির করা হয়। সুজন পলাতক রয়েছে।
রায় ঘোষণার আগে বিচারক মামলার বিষয়বস্তু তুলে ধরেন।
পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, “বর্তমান সময়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েছে। ছিনতাইয়ের পর আঘাত করার ঘটনাও ঘটছে। অনেকের মধ্যে ধারণা জন্মেছে, এসব ঘটনায় বিচার হয় না। সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায় না। এ মামলা ভিকটিমের বয়স ১৭ বছর আর উপার্জনক্ষম ছিল। সমাজের প্রতি বার্তা দেওয়ার জন্য এ মামলায় আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত।”
পরে আদালত আসামিদের সাজার রায় ঘোষণা করেন।
এ সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা মেহেদী হাসান বলেন, “স্যার, আমরা পোলাপাইন মানুষ, জীবন শেষ হয়ে গেল। বাঁইচ্যা তো লাভ নাই। পরকালে একটা বিচার আছে।”
পরে তাদের সাজা পরোয়ানা দিয়ে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। নেওয়ার পথে আসামিরা নিজেদের ‘নির্দোষ ‘দাবি করেন। বলতে থাকেন, পুলিশ মারধর করে জোর করে ‘তাদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করেছে’। তারা আরও বলেন, ‘এদেশে যার টাকা আছে, তার বিচার আছে’।
সুজন পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
এদিকে রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আদালতের অ্যাডিশনাল পাবলিক প্রসিকিউটর আবুল কালাম আজাদ। আর অসন্তোষ প্রকাশ করে উচ্চ আদালতে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী রেজাউল হক।
মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, ২০ বছর বয়সি সায়মন মিরপুর-১ নম্বরে সনি সিনেমা হলের পেছনে লিবার্টি গার্মেন্টসে ১০ হাজার টাকা বেতনে চাকুরি করতো। ২০২২ সালের ১১ অক্টোবর অফিস থেকে বেতন তুলে দুই সহকর্মী রিফাত হোসেন রাব্বি ও হৃদয় হাসানের সঙ্গে কেনাকাটা করতে মিরপুর-১ এ যান তিনি।
“কেনাকাটা শেষে রাত ৯ টার দিকে বাসায় ফেরার পথে, অজ্ঞাতনামা তিন ছিনতাইকারীর একজন আড়ং শপিং সেন্টারের সামনে সায়মনকে বলেন, সে নাকি তার ছোট ভাইকে মেরেছে। ‘কথা আছে’ বলে সায়মান ও রিফাতকে ভয়ভীতি দেখিয়ে রূপায়ন টাওয়ারের সামনে থেকে রিকশায় করে দারুস সালাম থানার কোনাবাড়ি হয়ে কাঁচাবাজারের সামনে নিয়ে যায়। শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের কাঁচাবাজারের সামনে রিফাতকে নামিয়ে দেওয়া হয় রিকশা থেকে। আর সায়মনকে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের ভেতর নিয়ে যায়। তিন ছিনতাইকারী চাকু বের করে ভয় দেখিয়ে সায়মনের কাছে যা যা আছে দিয়ে দিতে বলে।
“সায়মন মোবাইল ও টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারা তাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়। তার কাছে থাকা টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায় তারা। সায়মনের চিৎকারে আশপাশের লোকজন গিয়ে তাকে উদ্ধার করে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।”
এ ঘটনায় সায়মনের বাবা শাজাহান শেখ অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে দারুস সালাম থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তে নেমে দারুস সালাম থানা পুলিশ ইউসুফকে গ্রেপ্তার করে।
“পরে সে ইকবাল ও মেহেদী হাসানও ঘটনার সাথে জড়িত মর্মে স্বীকার করে। সায়মনের মোবাইল বিক্রির টাকা ইউসুফের বাসা থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। সুজনের কাছে সায়মনের মোবাইলটি ২২০০ টাকায় বিক্রি করার কথাও সে স্বীকার করে।”
মামলার তদন্ত শেষে ইউসুফ, ইকবাল ও মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে ছিনতাইয়ের পর হত্যার অভিযোগে এবং সুজনের বিরুদ্ধে চোরাই মাল নিজের কাছে রাখার অপরাধে ২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন দারুস সালাম থানার এসআই সোহান আহমেদ।
২০২৩ সালের ২ অগাস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু হয়। মামলার বিচার চলাকালে আদালত ১৮ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন।
এরপর আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানি, মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আজ আদালত থেকে আসামিদের সাজার রায় এল।








